![]() |
পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকার রেল প্রকল্পের কাজ চলছে বলে জানাল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সঙ্গে দিল্লির তরফে দাবি করা হয়েছে অতীতের তুলনায় নরেন্দ্র মোদী সরকারের জমানায় বাংলার রেল প্রকল্পের বরাদ্দের পরিমাণ তিনগুণ বেশি। কেন্দ্রের তরফে বলা হয়েছে ২০০৯-'১৪, এই পাঁচ বছরে বাংলায় রেলের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৪,৩৮০ কোটি টাকা। এখন তা বের হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রসঙ্গত ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের প্রথম ভাগে রেলমন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Ex Railways Minister)। তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর দীনেশ ত্রিবেদী এবং মুকুল রায় রেল প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। দিল্লি এখন পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল রেলের দায়িত্বে থাকার সময় যত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে বাংলার জন্য, নরেন্দ্র মোদীর সময় তা অনেক গুণ বৃদ্ধি হয়েছে।
রেলের তরফে বলা হয়েছে, মন্ত্রক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অঙ্গীকারকে পাথেয় করে বাংলার জন্য পর্যাপ্ত রেল প্রকল্প বরাদ্দ করেছে। অতীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছিলেন, 'আজ যখন ভারত একটি উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলার অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত এবং অপরিহার্য।' রেলের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তিটি ভারতের উন্নয়ন যাত্রায় পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এই রাজ্যটি পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের জন্য একটি ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করার সম্ভাবনা রাখে।
ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, বিধানসভা নির্বাচনের কথা বিবেচনায় রেখে কেন্দ্রীয় সরকার রেল প্রকল্পে বাংলার জন্য বরাদ্দের হিসাব প্রকাশ করেছে। মোদী সরকার দেখাতে চায় বাংলার প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ ভিত্তিহীন।
দিল্লির তরফে দাবি করা হয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় রেলওয়ে রাজ্যজুড়ে পরিকাঠামো সম্প্রসারণ, স্টেশনগুলির আধুনিকীকরণ এবং যাত্রী পরিষেবার উন্নতির মাধ্যমে এই অংশগ্রহণকে সম্ভব করে তুলতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রেল।পশ্চিমবঙ্গে রেল উন্নয়ন স্থবিরতা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে গেছে। এই সদিচ্ছা আর্থিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। রাজ্যের জন্য গড় বার্ষিক রেল বাজেট বরাদ্দ ২০০৯-১৪ সালের ৪,৩৮০ কোটি টাকা থেকে ২০১৪ সালের পর ১৩,৯৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। এই সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ৮৭,৮৬২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের রেল প্রকল্পের কাজ চলছে।
![]() |
দিল্লির দাবি, ২০১৪ থেকে ভারতীয় রেলওয়ে রাজ্যে ১,৩৬২ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করেছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট রেল নেটওয়ার্কের চেয়েও বেশি। সম্পন্ন হওয়া প্রধান প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে মন্দার হিল-রামপুরহাট নতুন লাইন (১৩০ কিমি), যা বীরভূম অঞ্চলে সংযোগের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছে। হলদিবাড়ি আন্তর্জাতিক সীমান্ত নতুন লাইন (৩ কিমি) বাংলাদেশের সাথে আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ বাড়িয়েছে এবং আরও অনেক প্রকল্প রয়েছে।
ডাবিলং এবং অতিরিক্ত লাইনের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধিও ব্যাপকভাবে হয়েছে। রামপুরহাট-মুরারই তৃতীয় লাইন (১৫৯ কিমি), পাঁশকুড়া-খড়গপুর ডাবিলং ৪৫ কিমি), লালগোলা-জিয়াগঞ্জ ডাবিলং (২৩ কিমি), কৃষ্ণনগর-বেথুয়াডহরি (২৮ কিমি) এবং নিউ কোচবিহার-গুমনিহাট ডাবিলংয়ের (২৯ কিমি) মতো প্রকল্পগুলি ব্যস্ত রুটগুলিতে যানজট কমিয়েছে এবং পরিচালন দক্ষতা উন্নত করেছে। এই প্রকল্পগুলি রাজ্যজুড়ে শহরতলি, আঞ্চলিক এবং পণ্যবাহী ট্রেন পরিষেবাকে সরাসরি উপকৃত করেছে। ২০১৪ সালের পর চালু হওয়া গেজ রূপান্তর প্রকল্পগুলো রেল নেটওয়ার্ককে আরও একীভূত করেছে। বর্ধমান-কাটোয়া গেজ রূপান্তর (৫২ কিমি), আহমেদপুর-কাটোয়া গেজ রূপান্তর (৫২ কিমি) এবং নিউ মাল জংশন-চ্যাংরাবান্ধা গেজ রূপান্তর (৬২ কিমি) প্রকল্পগুলো পূর্বে সীমাবদ্ধ থাকা বিভাগগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন ব্রড-গেজ সংযোগ নিশ্চিত করেছে, যা দ্রুত ট্রেন চলাচলে সহায়তা করছে।
অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে স্টেশন পুনর্গঠন এই রূপান্তরের একটি প্রধান বৈশিষ্ট। এই প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১০১টি স্টেশন নির্বাচিত হয়েছে, যার জন্য প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পানাগড়, জয়চণ্ডী পাহাড় এবং কল্যাণী ঘোষপাড়া—এই তিনটি স্টেশন ২০২৫-এর মে মাসে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন, যা দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং উন্নত যাত্রী সুবিধার প্রমাণ দেয়।
কেন্দ্রীয় বরাদ্দের হিসেব দেওয়ার পাশাপাশি দিল্লির তরফে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে অনুযোগ করা হয়েছে। ভারত সরকারের বক্তব্য, বর্ধিত বিনিয়োগ এবং ২০১৪ সালের পর বেশ কয়েকটি প্রকল্প চালু হওয়া সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রেল প্রকল্পের কাজ রাজ্য স্তরে জমি অধিগ্রহণ এবং সমন্বয়ের সমস্যার কারণে আংশিকভাবে সম্পন্ন বা বন্ধ হয়ে আছে।
শুধুমাত্র কলকাতা অঞ্চলেই বেশ কয়েকটি সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প থমকে আছে। হাওড়া-আমতা-বাগনান নতুন লাইন প্রকল্পের (৫৮ কিমি) সাথে বড়গাছিয়া-চাঁপাডাঙ্গা-তারকেশ্বর অংশের (৪০ কিমি) ৪২ কিমি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে, নিউ আলিপুর-আকরা ডাবলিং প্রকল্পের (৪১ কিমি) ১০ কিমি এবং সোনারপুর-ক্যানিং ডাবলিং প্রকল্পের (৫৩ কিমি) ১৫ কিমি কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় তহবিল এবং অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও উভয় প্রকল্পই পরবর্তীকালে বন্ধ হয়ে গেছে।
এই আংশিকভাবে সম্পন্ন কাজগুলো ছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক রেল প্রকল্প জমি অধিগ্রহণের সমস্যার কারণে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে আছে। উপকূলীয় অঞ্চল, শিল্প এলাকা এবং গ্রামীণ অভ্যন্তর জুড়ে বিস্তৃত ৫০টিরও বেশি নতুন লাইন প্রকল্প এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে তারকেশ্বর-মগরা (৫২ কিমি), আরামবাগ-চাঁপাডাঙ্গা (২৩ কিমি), কাটোয়া (দাঁইহাট)-মন্তেশ্বর (৩৪ কিমি), মন্তেশ্বর-মেমারি (৩৬ কিমি), জয়নগর-দুর্গাপুর (৩২ কিমি) এবং ডায়মন্ড হারবার-বহরাহাট (২১ কিমি) সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ করিডোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বারবার প্রচেষ্টা এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও, প্রধানত ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যা এবং রাজ্য স্তরের ছাড়পত্র পেতে বিলম্বের কারণে এই প্রকল্পগুলো আটকে আছে।
সম্পন্ন হওয়া প্রকল্প এবং আটকে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যেকার ব্যবধান একটি বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে: কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখন পরিকাঠামো নির্মাণের গতি বাড়ে। যেখানে সমন্বয় দুর্বল ছিল, সেখানে সম্পূর্ণ অনুমোদিত ও অর্থায়নকৃত রেল প্রকল্পগুলোও আটকে রয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে এবং সরকারি বিনিয়োগের সুফল প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটিয়েছে।
ভারত যখন একটি উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার দিকে অবিচলিতভাবে এগিয়ে চলেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং অনিবার্য। ২০১৪ সাল থেকে রেল খাতে যে রূপান্তর দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং স্পষ্ট উদ্দেশ্য কী ফল দিতে পারে। রাজ্যে ডাবল-ইঞ্জিন সরকার গঠিত হওয়ায়, রেল উন্নয়ন সিদ্ধান্তমূলকভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে পারে, যা অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে উন্মোচন করবে এবং ভারতকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যাত্রায় বাংলাকে তার যোগ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম করবে।
নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির চেষ্টা চলছে, ভারতবিরোধী প্রচার জটিলতার কারণ! মেনে নিলেন ইউনূস প্রশাসনের উপদেষ্টা
কড়া পদক্ষেপ দিল্লির নেই কেন, আক্ষেপ অন্দরেই
বড়দিনের আগে পার্ক স্ট্রিটে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা! কোন রাস্তায় কত ক্ষণ নিয়ন্ত্রণ, জানিয়ে দিলেন পুলিশ কমিশনার
রোজই তৈরি হচ্ছে নয়া রেকর্ড, আবার নতুন উচ্চতায় সোনা-রুপা

